image
ছবি: ঢাকা টাইম

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় জঙ্গি হামলার সাত বছর আজ শনিবার (১ জুলাই)। ২০১৬ সালের এই দিনে বেকারিটিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় মারা যান দেশি-বিদেশি ২২ জন। হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি বেকারিতে ঢুকে প্রথমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

বিপথগামী কয়েকজন তরুণের আত্মঘাতী এই হামলা অনেকটাই বদলে দেয় বাংলাদেশকে। সারাবিশ্বে সাড়া ফেলে দেয়া ওই ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বাংলাদেশ।

এদিকে ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার একটি আদালত সাত জঙ্গিতে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেন। পরে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। গত মে মাসে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয় হাইকোর্ট বেঞ্চে। তিন থেকে চার কার্যদিবস শুনানি হলে এ মামলায় হাইকোর্টের শুনানি শেষ হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলছেন, হাইকোর্টে জুলাই মাসে শেষ হবে আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি।

প্রতি বছর নিহতদের স্মরণে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের ওই বাড়িটি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ ছাড়াও নিহতদের পরিবার এদিন শ্রদ্ধা জানাবেন।

সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’

সেদিন রাতে কূটনৈতিকপাড়া খ্যাত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসে জঘন্য জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। এদিন রাত ৮টা ৫০ মিনিট থেকে রাতভর রুদ্ধশ্বাস এক জঙ্গি হামলার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছিল গোটা জাতি। ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টের’ মাধ্যমে অবসান হয় জঙ্গিবাদীদের ১২ ঘণ্টা ধরে চালানো নৃসংশতার। উদ্ধার হয় জিম্মিরা। মারা যায় পাঁচ জঙ্গি- নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম বাঁধন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, হলি আর্টিজান হামলার ঘটনার পর সাঁড়াশি অভিযানের ফলে দেশে জঙ্গি তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে জঙ্গিরা এখন হামলা না চালালেও তারা অন্য রূপে তৎপর বলে তথ্য উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা বলছে:

আগের মতো সংগঠিত না হলেও জঙ্গিরা বসে নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, জঙ্গিরা হয়ত ততটা সংঘটিত নন। তবে তারা বসেও নেই। জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে তৃপ্তি হওয়ার কিছু নেই। তারা অনলাইনে ভয়াবহ ভাবে সক্রিয় থেকে নতুন কর্মী-সমর্থক সংগ্রহ করছে। এটিইউর অনলাইন পেট্রোলিংয়ে আমরা অহরহ এসব দেখছি।’

এটিইউ প্রধান তথ্য দেন, এখন পর্যন্ত দেড়শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে এটিইউ আড়াইশর বেশি জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার এসব জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।

‘আপাতত শান্তিতে আছি বলে, জঙ্গিদের কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে বলে, আপাতত আত্মতুষ্টি নেই। একজন তরুণ বিপদ না বুঝে যেভাবে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এর বিপদও ভয়াবহ। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার সুযোগ আছে গণমাধ্যমের’—যোগ করেন অতিরিক্ত আইজিপি রুহুল আমিন।

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অভিযানগুলোতে দেখা গেছে জঙ্গিরা হামলা-সংঘর্ষের বদলে এখন সদস্য আর অর্থ সংগ্রহ দিকেই বেশি মনোযোগী। তারা এখন অনলাইন বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বেশি সক্রিয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল যা বললেন:

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আশা করছি জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে মামলা শেষ হয়ে যাবে। আর দুই বা তিন শুনানির পর সব শেষ হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত এই মামলার শুনানি শেষ করতে চাই। সেই সঙ্গে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড যাতে বহাল থাকে সেই চেষ্টাও করব।’ পুরো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ দেখিয়েছে জঙ্গিবাদে ছাড় দেয়া হয় না_ যোগ করেন আমিন উদ্দিন।

কী ঘটেছিল সেই রাতে:

তখন রমজান মাস চলছিল। ইফতার শেষে হঠাৎ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। দ্রুতই তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে গুলশানে জঙ্গি হামলার কথা।

ঘটনা শুরু রাত পৌনে নয়টার দিকে। রাত ৮টা ৪২ মিনিটের দিকে হলি আর্টিজানের মূল ফটকে যায় জঙ্গি নিবরাস ইসলাম ও মীর সামেহ মোবাশ্বের। একটু পর রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম বাঁধন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়।

ফটকের নিরাপত্তাকর্মী নূর ইসলাম তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে নিবরাস তার ডান চোখের নিচে ঘুষি মারে। এরপরই পাঁচ জঙ্গি হলি আর্টিজানের ভেতর ঢুকে যায়। ঢুকেই গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ভেতরে থাকা সবাইকে জিম্মি করে।

জঙ্গিদের প্রতিরোধে সেখানে এগিয়ে গিয়েছিলেন গুলশানের এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিন। হলি আর্টিজানের আঙিনায় ঢুকতেই জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান তারা।

মুহূর্তেই সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। ঢাকার গুলশানে জঙ্গি হামলা খবর বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচার হতে থাকে।

আধা ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচ জঙ্গি গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেশি-বিদেশিদের হত্যা করে। বিভিন্ন রুম, টয়লেট, চুলার ঘর, হিমঘর ইত্যাদি স্থান থেকে বিদেশিদের বের করে এনে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়।

রাত ১০টার দিকে র‌্যাব, পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কয়েক শ সদস্য ঘটনাস্থল ঘিরে অবস্থান নেন। সারাদেশের মানুষ শ্বাসরুদ্ধর সময় কাটায় রাতভর।

জঙ্গিদের নির্মূলে অভিযান:

পরদিন সকাল ৭টা ৩০ মিনিট। সেনা, নৌ, পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল হলি আর্টিজানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘থান্ডার বোল্ট’।

৭টা ৪৫ মিনিট: কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। প্যারা কমান্ডো সদস্যরা ক্রলিং করতে করতে সামনে দিকে এগোতে থাকেন এবং গুলি ছুড়তে থাকে পদাতিক ডিভিশন ও স্লাইপার টিম। এসময় জঙ্গিরাও গুলি ছুড়তে থাকে।

সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসে। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তার মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।

৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।

৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।

সকাল ১০টায় চারজন বিদেশিসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মৃতদেহ পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।

মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ:

হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় গুলশান থানা দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করে ঢাকার সিটিটিসি। এই হামলায় মোট ২১ জনের সম্পৃক্ততা পায় তদন্ত সংস্থাটি। এর মধ্যে পাঁচ জঙ্গি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এছাড়া পুলিশ ও র‌্যাবের বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয় আরও আটজন। জীবিত বাকি আটজনকে আসামি করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

সিটিটিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ঘটনার প্রায় দেড় বছর আগে পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে নৃশংস এ হামলা সরাসরি বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেওয়া হয় আত্মঘাতী পাঁচ জঙ্গিকে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে জেএমবির একটি গ্রুপ বিদেশিদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

পরবর্তীতে ‘নব্য জেএমবি’ নামে পরিচিতি পাওয়া এ গ্রুপটির কথিত শুরা কমিটি গাইবান্ধার সাঘাটায় বৈঠক করে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।

সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড:

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা মামলায় ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ৭ আসামি

দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। বিচারিক কার্য্ক্রম শুরুর এক বছরের মধ্যেই আদালত মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে মামলার আট আসামির সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করে।

(ঢাকাটাইমস/৩০জুন/এসএস/কেএম)


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।