ছবি: নয়া দিগন্ত


প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের আটটি নিপীড়নমূলক ধারা বাতিল এবং চারটি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)। এ ছাড়া প্রচলিত ফৌজদারি আইনের বর্ণিত অপরাধগুলো এ আইনের আওতামুক্ত রাখা অপরিহার্য বলে মনে করে বিএফইউজে। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বিএফইউজে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪০ ও ৪২ নম্বর ধারা বাতিল এবং ২১, ৪৩, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ধারা সংশোধন করে সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ফৌজদারি আইনে মানহানিসহ যেসব অপরাধ ও সাজা নিশ্চিত করা আছে সেসব অপরাধকে আলাদা করে সাইবার নিরাপত্তা আইনে যুক্ত করে অধিকতর শাস্তির প্রস্তাব পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে বিএফইউজে। বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ ও মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন স্বাক্ষরিত প্রস্তাবনায় সরকারের কাছে এ মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের সাথে বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। মূলত ক্ষমতা ও গদির নিরাপত্তার জন্যই ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্তর্জাতিক মহলকে ধোকা দিতে নাম বদলে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ নামে ফের নিপীড়নমূলক জঘন্য আইন করার পথে হাঁটছে সরকার।
খসড়া আইন পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে- ২১ নম্বর ধারায় ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডা বা প্রচারণাকে অপরাধ গণ্যের পাশাপাশি উল্লেখিত কর্মকাণ্ডে মদদ প্রদানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ঠুনকো অজুহাতে এ ধারাটির অপপ্রয়োগ হয়েছে ব্যাপকভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও তার আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দুঃসহ কারাজীবন ভোগ করতে হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে এ ধারার অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ছাড়াও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই ধারাটির যথেচ্ছ অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২২ নম্বর ধারায় ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি করাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই ধারার অপরাধের ব্যাখ্যায় জালিয়াতি বলতে কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইসের ইনপুট বা আউটপুট প্রস্তুত, পরিবর্তন, মুছিয়া ফেলা ও লুকানোর মাধ্যমে অশুদ্ধ ডাটা বা প্রোাগ্রাম, তথ্য বা ভ্রান্ত কার্য, তথ্য সিস্টেম, কম্পিউটার বা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকে বুঝানো হয়েছে। এ ধারার অধীনে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কনটেন্টকে অপরাধ বিবেচনার সুযোগ থাকবে। প্রস্তাবিত আইনের ২৩ ও ২৪ নম্বর ধারাও অনুরূপ।
প্রস্তাবিত আইনের ২৫ নম্বর ধারাটি অধিকতর বিপজ্জনক। এই ধারায় বলা হয়েছে- আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশকে অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- ‘(ক) ইচ্ছাকৃত বা জ্ঞাতসারে এমন কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শন অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয়প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণœ করিবার বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন তা হলে ওই ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হবে একটি অপরাধ।’
এ অপরাধের শাস্তি প্রস্তাব করা হয়েছে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনুধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। সাইবার নিরাপত্তা আইনের এই ধারাটি সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকবে। কারণ কে কোন সংবাদে ‘বিরক্ত’, ‘অপমান’, ‘অপদস্ত’ বা ‘রেহয়প্রতিপন্ন’ হবেন তা নিরূপণ করা সাংবাদিকদের পক্ষে কঠিন হবে।
আইনের ২৬ নম্বর ধারাটিও সাংবাদিকদের জন্য হুমকি হতে পারে। এতে আইনগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ এবং তা ব্যবহার করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সংবাদকর্মীরা নিয়মিতই নানা ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এই ধারার অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক দুই বছর বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
২৮ নম্বর ধরায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচারকে অপরাধ গণ্য করে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের বিধানেরও অপপ্রয়েগ দেখা গেছে।
প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৯ নম্বর ধারাটিও সংবাদকর্মী ও সংবাদমাধ্যমের জন্য খড়গ হয়ে দেখা দেবে। মানহানিকর তথ্য ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে প্রচার ও প্রকাশ করলে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত অপরাধকে হুবহু আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ফৌজদারি আইনে একই অপরাধের বিচারে শাস্তির বিধান থাকায় সাইবার নিরাপত্তার সাথে মানহানির এ ধারা যুক্ত করা অগ্রহণযোগ্য।
আইনের ৩১ নম্বর ধারাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনুরূপ বহাল রাখা হয়েছে যার ভুক্তভোগী প্রধানত সাংবাদিকেরা। এতে বলা হয়েছে, ওয়েবসাইটে বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করা হয় যা বিভিন্ন শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশ্ঙ্খৃলার অবনতি ঘটায় বা ঘটার উপক্রম হয়, তার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে। মূলত এ ধরনের বিধানের কারণেই দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম অসহায় হয়ে পড়ে।
৩২ নম্বর ধারায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করে অনধিক সাত বছর কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের বিধান এরই মধ্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহারের কুনজির রয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতোই সাইবার নিরাপত্তা আইনের ৪০ নম্বর ধারায় পুলিশকে কম্পিউটার সিস্টেম ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দের অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ৪২ নম্বর ধারায় পুলিশকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাতে রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টির সুযোগ থাকবে। এতে বলা হয়েছে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে বা হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ধারণা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণ, তল্লাশি, সরঞ্জাম জব্দ, ব্যক্তির দেহ তল্লাশিী এবং গ্রেফতার করতে পারবে।
৪৩ নম্বর ধারায় সাব-ইন্সপেক্টরের ‘নিচে নহেন’, এমন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের’ ক্ষমতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতোই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তি লঘু করার কথা বলা হলেও অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রথমেই সন্দেহ বশত পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারবে এবং তল্লাশি ও জব্দের নামে সব ধরনের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে। ৪৫ নম্বর ধারায় উল্লেখিত ক্ষেত্রে পুলিশকে বাধা না দিয়ে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এ জন্য বিএফইউজে মনে করে সাইবার নিরাপত্তা আইনটিও মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা ছাড়া এ আইন পাসের পথ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে সারা দেশের সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বিএফইউজে। বিজ্ঞপ্তি।


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।