durgotsob samakal cba
ছবি: সমকাল

এক সময়ের সিকি-আধুলি যেমন মূল্যহীন হতে হতে দুষ্প্রাপ্য হয়ে অমূল্য হয়ে যায়; মানুষের জীবনটাও বোধকরি তাই। গোপনে জমানো মাটির ব্যাংকে কখন কোন ঘটনা পয়সার মতো ঝনঝন করে ওঠে- তার হিসাব কে রাখে? নইলে, এই অবেলায় বড় রাস্তা ফেলে অলিগলির সন্ধানই বা করছি কেন? আসলে, সবার মাঝে বড় হয়েও সবার মতো হতে পারিনি বলেই হয়তো আপাততুচ্ছ ঘটনাকে এমন আগ বাড়িয়ে সবাইকে শোনাতে চাচ্ছি। জীবনে যা পেয়েছি, তা একান্ত নিজের অবান্তর স্বপ্নের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। আজ তাই সেলাই করতে বসেছি সেই অগোছালো দিনের টুকরো কিছু অংশ। 

খুব ছোটবেলায় আমার নিজস্ব একটা কল্পনার নীড় ছিল; অন্য অনেকেরই যেমনটা থাকে। হাতে লবণ নিয়ে কাঁঠালের মুচি,পানা-পুকুরের ঘোলা জলে সাঁতার কিংবা টাকি মাছ ধরা, কচুরিপানার রঙিন বেগুনি ফুলে মুকুট, কচি লালশাকের বিছানা, পকেটভর্তি সুপার বিস্কুট, খাঁচায় বন্দি ময়না পাখির ঠোঁট- এমন কতশত বিষয় বাস করে স্মৃতিঘরে। সেই ঘরের উঠানেই পড়ে থাকে আমার রং ওঠা লাটিম, ছোট ছোট গর্তওয়ালা মার্বেল, বাঁশের বেতের নাটাই, সিরামিকের গোলাকার বাটি আর একটি পেয়ারা গাছ। 

সেইবার স্কুল ফাইনালের পর লম্বা ছুটিতে যাই কিশোরগঞ্জে পিসির বাড়িতে। বেশ কিছুদিন থাকি, ঠিক মনে আছে। সেখানকার কোনো এক হাটের দিন পেয়ারা গাছটা কিনি দুই টাকা দিয়ে। টাকা দেয় ছোট পিসি। পিসিদের বাড়িটা এমন এক জায়গায়, যার আশপাশে অনেকগুলো কাঠগোলা। সবসময় সেখানে পড়ে থাকে বড় বড় গাছের বিশাল বিশাল নিস্তেজ দেহ। আম বা সেগুনের কাটা শরীরে গোটা গোটা আঠা জমে শিশিরের মতো। মেটে-হলদে সেই আঠা তুলি কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। আঠার গন্ধটাও একদম অচেনা। শহুরে ছেলে সেই ঘ্রাণ পাবে কোথা থেকে? মাঝেমধ্যে দেখি, মস্ত বড় করাত নিয়ে গাছ কেটে কাঠ আলাদা করে কালো পাটাতন স্বাস্থ্যের শক্তিমান পুরুষের দল। ঘাম ঝেড়ে কাজ সেরে চলে যাওয়ার পর পড়ে থাকা কাঠের মাওয়া হাতের মুঠো ভরে বাড়ি ফিরি। পিসি দেখে বলে, এইডি কি ছাইভস্ম লইয়া আইছস? এহনি ফ্যাইলা হাতমুখ ধুইয়া ঘরে ওঠ। 

পিসিকে কী করে বোঝাই, সদ্য চেরা সেই গুঁড়া দুধের গন্ধ আমাকে অন্ধ করে দেয়। তাই হাতের ভাগেরটা ফেলে দিলেও, হাফ প্যান্টের পেছন পকেটে রাখাগুলো জমা থাকে ঠিকই।

অল্প দিনেই পিসিদের বাড়ির অনেকের সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে যায়। আনন্দ, শ্যামল, বাসু, লিমন, সুমন- এমন অনেকের সঙ্গে সারাদিন খেলা করি কাঠগোলায়। ক্রিকেট, দাঁড়িয়াবান্দা খেলা তো আছেই- সেই সঙ্গে বোমবাসটিং। এটা আর তেমন কিছুই না, একটা টেনিস বল নিয়ে খেলা। বলটি নিয়ে সামনে যাকে পাওয়া যায় তাকেই ছুড়ে মারতে হয়- এটুকুই। অপরকে আঘাত করাতেই এ খেলার আনন্দ। এভাবেই এক স্বাধীন দিন কাটে আমার। সকালে উঠেই নিরালা হোটেলের মোটা মোটা পরোটার সঙ্গে ডাল-ভাজি। তারপর মোরগমহলে পিসামশায়ের ওষুধের দোকানে বসে দোকানদারি করা, দুপুরে খাওয়ার পর লম্বা ঘুম, বিকেলে কাঠগোলায় একে একে সবাই জোড়ো হয়ে খেলার আয়োজন আর পেয়ারা গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকা- কত ব্যস্ততা যে, বলে শেষ করা যাবে না। স্কুল নেই, তাই পড়াশোনার কোনো বালাইও নেই। উফ! সে কি দিব্যি বিহঙ্গ জীবন! 

কোনো একবার পিসির বাড়িতে যাই পূজার ছুটিতে। মেথরপট্টির পাশের ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপূজার নামডাক বেশ। সুইপার কলোনিটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে আসে উৎকট গন্ধ। পাশের খোলা মাঠে চরে বেড়ায় কাদাজলে মাখা মোটা মোটা শূকর। পেছন পেছন গুটিসুটি পায়ে হাঁটে শূকরের ছানাপানা। যাই হোক, পিসিদের বাড়ির পূজার কথায় আসা যাক। এটা এমন ফলাও করে বলার একটা কারণ অবশ্য আছে। সেবারের পূজায় ধূপধুনো আরতি প্রতিযোগিতায় আমি সেকেন্ড হই। ঢাকের তালে তালে সে কি নাচ! ভালো-মন্দ বিচার করার বয়স নয় তখন। মনে আছে, ঢাকের শব্দে আত্মভোলা হয়ে সর্বাঙ্গে নাচি। তাল-লয়-ছন্দ হয়তো সে নাচে ছিল না, তবে বিজয়ীর নামের তালিকায় নিজের নামটি দেখে আমাকে আর পায় কে? সেই প্রতিযোগিতায় শ্যামলের দাদা আনন্দ সেজেছিল কৃষ্ণ। সন্ধ্যায় শুরু হবে আরতি। পড়ন্ত বিকেলে ওদের বাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি আনন্দের দিদি চম্পা তার ছোট ভাইটিকে খাটে বসিয়ে যত্ন করে কৃষ্ণ সাজাচ্ছে। দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ভ্রূর ওপর বসাচ্ছে ছোট ছোট চন্দনের ফোঁটা। কোমরে পেঁচিয়ে দিচ্ছে ধবধবে সাদা ধুতি। কৃষ্ণবর্ণের আনন্দ নেচেছিল বেশ। কিন্তু সে হলো থার্ড। এতে তার সে কি কান্না! সেকেন্ড প্রাইজে আমি পেয়েছিলাম সিরামিকের গোলাকার একটি সাদা বাটি। সে বাটিতে করে পিসির বাড়িতে সে রাতেই দুধভাত খাই বিচিকলা দিয়ে।

আমার পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে ছোট্ট মফস্বলে একটা শোরগোল পড়ে যায়। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই আমার দেখা হয় বাসুর স্কুল মাস্টার বাবার সঙ্গে। তিনি ছিলেন সেই আরতি প্রতিযোগিতার একজন বিচারক। আমাকে দেখেই হেসে বলেন- কী, সেকেন্ড বয়, মিষ্টি কোথায়? 

এ কথার উত্তরে আমি কোনো শব্দ না করে শুধু লজ্জায় হাসি। পিসির বাড়ি থেকে ফেরার সময় আমি অহংকারী মন নিয়ে ময়মনসিংহে ফিরি। সঙ্গী হয় পেয়ারা গাছ ও সিরামিক বাটি। বাড়িতে এসেই পেয়ারা গাছটিকে উঠানের এক পাশে লাগিয়ে দিই। জল দিই। গাছের সঙ্গে একটা চিকন কাঠি বেঁধে দিই রশি দিয়ে। আর সেই সিরামিকের বাটিটি নিয়ে খেলা করি, রাতে ভাত খাই মাঝেমধ্যে। বাটিতে এত ভাত ধরত যে, তা পেটে আঁটত না। অন্যদিকে সেই পেয়ারা গাছটিকে দেখতাম দিন দিন আকাশের দিকে হাত বাড়াতে। স্কুলে যাওয়ার আগে গাছটির সঙ্গে কথা বলতাম আর গোড়ায় জল দিতাম সিরামিকের বাটি ভরে। প্রতিদিনই গাছের সঙ্গে নিজের উচ্চতা মাপতাম। আমার চেয়ে বেঁটে বলে ঠাট্টা-মশকরা করতাম। তবে এই মশকরা বেশি দিন টেকেনি। তড়তড় করে বাড়তে থাকে গাছটি। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমি তো আর বাড়তে পারি না। লম্বা হওয়ার জন্য কসরত করে বাঁশে ঝুলে থাকি। সপ্তাহান্তে আধা ইঞ্চিও বাড়ি না। এক সময় পেয়ারা গাছটির কাছেই আমি বামন হয়ে যাই। মাথা উঁচু করে তাকে দেখতে হয়। সে সময় বাতাসে দোল খেতে খেতে আমার দিকেই তাকিয়ে রসিকতার হাসি হাসে সেটি। লজ্জায় মাথানত করে রাখি। মনে মনে অবশ্য খুশিই হই। নিজের হাতে গড়া সেই ছোট্ট চারাটি এভাবে একদিন গাছ হয়ে যায়। 

ময়মনসিংহের যে কানাগলির পাড়াটিতে আমরা থাকতাম, লোকমুখে তার নাম ছিল ‘লাইলিপট্টি’। এ নামটির পেছনে একটি পুরোনো ইতিহাস আছে। মোটাদাগে, ওখানে অনেক ‘লাইলি’র বাস ছিল বলে ছোট সেই মফস্বল শহরের মানুষের মুখে মুখে ঘুরত। এর কারণ হয়তো আমাদের পাড়ার মেয়েরা অন্য পাড়ার মেয়েদের থেকে ছিল বংশপরম্পরায় প্রতিযোগিতামূলক সুন্দরী। আর তাই পাড়াটিতে সময়ে-অসময়ে কারণে ও অকারণে ঘুরপাক খাওয়া চেনা-অচেনা ‘মজনু’দের দেখতে দেখতে আমরা বড় হয়েছি। তবে কৈশোরে সদ্য গজানো গোঁফের মতো লজ্জাবোধের জন্ম হওয়ার পর সেই ‘আরোপিত’ অথচ ‘পরিচিত’ নামটি বেশ সংকোচে ফেলে দিত বৈকি! তাছাড়া ‘পাড়া’কে ‘পট্টি’ বলা যত না আঞ্চলিকতায় দুষ্ট ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল ‘অভব্যতা’, সেটা জেনেছি আরও অনেক পরে। কারণ শহরের গাঙ্গিনারপাড়ের সবচেয়ে বড় ‘খারাপ পট্টি’টি ছিল আমাদের পাড়া থেকে হাঁটাপথে দু-তিন মিনিটের। 

মশকরা করেই হোক কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ কারণেই হোক- এই নামকরণের পেছনের আসল কারণ ছিল অনেকেরই অজানা। বহুদিন পর জেনেছি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাড়াটি ছিল স্বর্ণকুমারী দেবী নামে এক নিঃসন্তান বারনারীর। তিনি ছিলেন বিপত্নীক ও সন্তানহারা ভূস্বামী লালাশঙ্কর রায়ের উপপত্নী। ‘লালাশঙ্কর’ নামের সূত্র ধরেই ‘লাইলি’ শব্দের ব্যুৎপত্তি বলেই সর্বজনগ্রাহ্য হয়। সেই থেকে পাড়াটি ‘পট্টি’ হয়ে যায়। যদিও পাড়াটির একটা কেতাদুরস্ত নাম ছিল : ‘লালালজ’। তবে সেই নামে কাউকে কোনোদিন ডাকতে শুনিনি। সরকারি দপ্তরেও একটি নাম ছিল। সেটি আরও ভারিক্কি : এ. বি. গুহ রোড। সংক্ষিপ্ত নামের পূর্ণরূপ অনাথবন্ধু গুহ রোড। গভর্নমেন্টের হোল্ডিং বোর্ড কিংবা হলুদ খামে আসা চিঠি ছাড়া এর ব্যবহার তেমন একটা চোখে পড়ত না। 

আমার জন্ম ওই পাড়ায়। আমার বাবার জন্মও তাই। বড় হয়ে একদিন হঠাৎ শুনি, আমরা ওখানকার কেউ নই। বিত্তশালী সুরুজ্জামান মিয়া ও আমাদের পাড়ায় আশ্রিত দবির কাকা একদিন দাবি করে, ওই পুরো পাড়াটিই নাকি তাঁদের। যুগ যুগ ধরে সেখানে বাস করা নিম্নবর্ণের ও পেশার দরিদ্র হিন্দুরা সেই অসম শক্তির কাছে এক সময় পরাস্ত হয়। আগমনী শীতের কোনো এক মাসের শেষ দিকে পাড়াটি ছাড়তে হয় আমাদের। 

হিন্দু অধ্যুষিত সেই এলাকাটিতে আমাদের মতো আরও অনেক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয় একযোগে। আমাদের পরিবারের ঠাঁই হয় পাশের রামবাবু রোডের জেঠার বাড়িতে। সেদিন থেকে নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়ি সবাই। আমার রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা পরম আত্মীয় ‘অশিষ্ট’ সেই পট্টিটি এক সন্ধ্যায় প্রতিবেশী ‘পাড়া’ হয়ে যায়।

সেদিনের সন্ধ্যার কথাটি আজও মনে দগদগে হয়ে আছে। বিজয়া দশমী ছিল। ঠাকুর বিসর্জন দিতে বাড়ির কেউ নদীতে যায়নি। তাই সন্ধ্যার পরপরই সদলবলে ঘর থেকে বেরনোর প্রস্তুতি চলে। মা ও ঠাকুরমা কাঁদছিল খুব। কারণ আমার ঠাকুরদা’র মৃত্যুর চিহ্ন ছিল সেই বাড়িটিতে। আমার বাবার শবযাত্রাও হয় সেখান থেকে কেওয়াটখালী শ্মশানে। পুরো পাড়াটিতে তখন বইছিল সেই কেওয়াটখালীর নৈঃশব্দ্যতা। অন্ধকারে হাতে টর্চলাইল জ্বেলে আগে আগে হাঁটছিল বড়দা। মায়ের আঁচল ধরে আমিও নীরবে হাঁটছিলাম। কান্না পাচ্ছিল খুব। তবে মনের ওপর পাথর চেপে ঝরনার ফোয়ারা আটকে রাখি। ঘর থেকে বেরিয়ে আসি উঠানে। দু-পা এগুতেই পাশ থেকে কে যেন আমাকে টেনে ধরে। প্রথমে ভেবেছিলাম, ছোট কাকা। কিন্তু না। সেই পেয়ারা গাছটির একটি ডাল আটকে যায় জামার কোনায়। ছাড়াতে গেলাম। পারলাম না। চাপা পাথরটিও যেন সেই সঙ্গে নড়ে বসে। জড়িয়ে ধরি গাছটিকে। আমার কান্না দেখে মা প্রবোধ দেয়। নতুন বাড়িতে আরেকটা গাছ কিনে দেওয়ার আশ্বাসও দেয়। কিন্তু কিছুতেই মন সায় দেয় না। কাঁধের ঝোলা থেকে সিরামিকের বাটিটি বের করি। সেটায় জল ভরে পেয়ারা গাছটিতে দিতে গিয়ে দেখি, জল গড়িয়ে পড়ছে। কখন কীভাবে সেটির তলা ফেটে গেছে, টেরই পাইনি। মাকে বলি, আমি না থাকলে, কে গাছটিকে জল দেবে? ও তো না খেতে পেয়ে মরে যাবে। 

মাকে বলি, ওকেও নিয়ে চলো আমাদের সঙ্গে। বহরের সামনে থাকা বড়দা তাড়া দেয়। মা বলে, চল, দেরি করিস না। আমি নাছোড়বান্দা। গাছটিকে নেবই নেব। আমার জেদ দেখে মা বলে, বেশ, পারলে টেনে ওঠা ওটাকে।

এককালে কোমল হাতে যেই চারা গাছটিকে একদিন মাটিতে পুঁতেছিলাম, এতকাল পর তার শেকড় এত গভীরে পৌঁছে যায় যে, হেঁচকা টানে সেটা উপড়ে ফেলা আমার কিশোর হাতের পক্ষে সম্ভব হয় না। এমনকি আমার সঙ্গে মা, বড়দা, কাকা, ঠাকুরমা মিলেও চেষ্টা করে সেটাকে মাটি থেকে এক ইঞ্চিও তুলতে পারি না।


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।