ছবি: নয়া দিগন্ত


গাজীপুরে মাস্টার সিমেক্স পেপার মিলের মেশিনে কাটা পড়ে একজন শিশু শ্রমিকের ডান হাতের কব্জি ও বাম হাতের চার আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও কোনো দায় দায়িত্ব নিচ্ছে না কারখানা কর্তৃপক্ষ।

শিশুটির দরিদ্র বাবা থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি তার। অবশেষে আদালতে মামলা দিলেও কারখানার প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষ তদন্ত প্রভাবিত করছে বলে বাদীর অভিযোগ।

কারখানাটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, একাধিক শিক্ষাবোর্ডসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বইপুস্তক ছাপানো ছাড়াও নিয়মিত বিভিন্ন প্রকাশনার কাজ করে থাকে।

মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড নামের আলোচিত কারখানাটি গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের কুদাব এলাকায় অবস্থিত। নরসিংদীতেও তাদের আরেকটি সচল ইউনিট রয়েছে। শিশু শ্রমিকের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রহস্যজনক কারণে কারখানার পূবাইল ইউনিটের সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ।

কারখানায় কর্মরত অবস্থায় মেশিনে কাটা পড়ে হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া ওই শিশুর নাম ইসমাইল হাসান সোহেল (১৪)। তার বাবা আলম মিয়া পেশায় একজন রিকশাচালক, মা আজিয়া বেগম একটি পোশাক কারখানার অনিয়মিত শ্রমিক। তাদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানার ভাটিয়াপাড়ায়। কারখানার পাশে পোড়ানটেকের একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় তাদের বাস। হত দরিদ্র এ দম্পতির একমাত্র ছেলে ইসমাইল হাসান সোহেল স্থানীয় একটি মাদরাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়তো।

শিশুটির বাবা আলম মিয়া জানান, অভাব অনটনের কারণে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কাজের সন্ধানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাজীপুর শহরে এসেছিলেন। নিজে একটি গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় রিকশা চালাতে শুরু করেন এবং স্ত্রী আজিয়া বেগমকে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি দেন। মাস্টার সিমেক্স পেপার কারখানার ম্যানেজার রফিক তার রিকশার নিয়মিত যাত্রী ছিলেন। রফিকের পরামর্শেই সংসারের অভাব গোছাতে ছেলের লেখাপড়া বন্ধ করে কারখানাটিতে গত দুই মাস আগে অফিস সহায়কের চাকরি দেন। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ শিশু ইসমাইল হাসান সোহেলকে দিয়ে অফিসের কাজের পরিবর্তে প্রায়ই মেশিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করাতো। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে প্রায়ই চড়-থাপ্পড়সহ শারীরিক নির্যাতন করতো। বিষয়টি ম্যানেজার রফিককে জানানো হলে তিনি দেখবেন বলে আশ্বাস দিলেও পরে কোনো প্রতিকার করেননি। ঘটনার দিন গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ইসমাইল হাসান সোহেল ঝুঁকিপূর্ণকাজ ভারি মেশিন চালাতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে ধাক্কা দিয়ে মেশিনের ওপর ফেলে দেয়। এতে তাৎক্ষনিক তার ডান হাতের কব্জি মেশিনে কাটা পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একইসাথে বাম হাতের চারটি আঙ্গুলও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কারখানার কর্মচারিরা তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে ফেলে রেখে চলে আসে। পরে তার মাকে ফোনে ঘটনা জানায়। স্বজনরা খবর পেয়ে দ্রুত পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

আজিয়া বেগম বলেন, খবর পেয়ে পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলেকে হাসপাতালের বারান্দায় বিনা চিকিৎসায় মেঝেতে পড়ে কাতরাতে দেখি। পরে তাৎক্ষনিক তাকে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি। ঋণ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে ছেলের চিকিৎসা করাই। এখনো কারখানা কর্তৃপক্ষ ছেলেটির কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। আমরা ফ্যাক্টরিতে গেলে ঢুকতে দেয়া হয় না। এমনকি আমার ছেলের মোবাইল ফোনটাও তারা এখনো ফেরত দেয় নাই। পূবাইল থানায় মামলা করতে গেলে থানার তৎকালীন ওসি অভিযোগ গ্রহণ করেননি। অবশেষে আদালতে গিয়ে মামলা করি। কারখানার প্রভাবশালী মালিক মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে এবং মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করছে।

এ ব্যাপারে কারখানায় যোগাযোগ করা হলে ম্যানেজার (অ্যাডমিন) ইয়াদি আমিন সুমন বলেন, আমাদের এই কারখানায় এ ধরণের কোনো ঘটনা ঘটিনি। আমরা ইসমাইল হাসান সোহেল নামের কাউকে চিনি না।

আদালতে মামলার প্রসঙ্গ বলা হলে তিনি বলেন, আমাদের এই কারখানার নাম মাস্টার সিমেক্স না। মামলার বিবাদী মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের এমডি মো: কবির হোসেন, চেয়ারম্যান বেলাল আহমেদ চৌধুরী, ম্যানেজার মো: রফিক এবং মেশিন অপারেটর মো: সাইদুল নামেও এখানে কেউ নেই বলে তিনি দাবি করেন।

তার এ বক্তব্য খণ্ডনের জন্য আহত শিশুর বাবা-মা ও ফুফুকে কারখানায় ডেকে আনলে তিনি একপর্যায়ে ঘটনা স্বীকার করে বলেন, ইসমাইল হাসান সোহেল আমাদের শ্রমিক না। তিনি একজন ঠিকাদারের আন্ডারে আমাদের কারখানায় কাজ করতেন।

কারখানার মালিক অত্যন্ত ভালো লোক দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের মালিক ক্ষতিপূরণ দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ না করে বিভিন্ন স্থানে দৌড়াচ্ছে।

কারখানার সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঝড়ে সাইনবোর্ড পড়ে যাওয়ায় অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে।

এদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী মো: হাবিবুর রহমান বলেন, শিশুটি সারা জীবনের জন্য স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। আজীবন তাকে অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হবে। ছেলেটি খাওয়া দাওয়া, গোসল, মলমূত্র ত্যাগ, শৌচকাজ, পোশাক পরা বা খোলা তথা অত্যাবশক কোনো কাজ অন্যের সাহায্য ছাড়া করতে পারবে না।

তিনি বলেন, সকল আসামি পরস্পর যোগসাজস করে বাদির অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে ভিকটিম ইসমাইল হাসান সোহেলকে ফুসলিয়ে কাজে নিয়ে বিপদজনক কাজে নিয়োগ দিয়ে দন্ডবিধির ২৮৭/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪ ধারায় অপরাধ করেছেন। আদালত আমাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মহানগর ডিবি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।